মানুষের চোখ শুধু দেখার অঙ্গই নয়, এটি তার অনুভূতি, আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশক। জন্মগত ত্রুটি, দুর্ঘটনা কিংবা রোগজনিত কারণে চোখ হারানো ব্যক্তি শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক ও সামাজিক সংকটে পড়েন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে আজ কৃত্রিম চোখ সেই সংকট অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করছে। বিশেষত কাস্টমাইজড কৃত্রিম চোখ একজন মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই প্রবন্ধে কৃত্রিম চোখ, এর প্রয়োজনীয়তা, ধরন ও সুবিধা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

১. কৃত্রিম চোখ (Artificial Eye Ball)

একজন মানুষের চোখের মাধ্যমেই তার ব্যক্তিত্ব অনেকাংশে প্রকাশ পায়। যাদের জন্মগতভাবে চোখ নেই কিংবা অপারেশন অথবা দুর্ঘটনাজনিত কারণে চোখ হারাতে হয়েছে, তাদের কষ্টের সীমা থাকে না। আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিল্পকলার সমন্বয়ে পলিমার ফাইবার পিএমএমএ (PMMA) অথবা সিলিকন দিয়ে তৈরি কাস্টমাইজড কৃত্রিম চোখ আজ এমন এক সমাধান এনে দিয়েছে, যার মাধ্যমে কোনো প্রকার সংকোচ ছাড়াই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেকে উপস্থাপন করা সম্ভব।

২. কেন কৃত্রিম চোখ সংযোজন করবেন

সময়মতো সঠিক মাপের কৃত্রিম চোখ সংযোজন না করলে অক্ষিকোটরের চারপাশের মাংসপেশি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ভেতরের গঠন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বাইরে থেকে ধুলাবালি ও পানি ঢুকে সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা পরবর্তী সময়ে আরও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ ছাড়া সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে একাকিত্ব তৈরি হয়। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পড়াশোনায় অনীহা দেখা দেয়, কর্মজীবনে ভালো সুযোগ পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

৩. কাস্টমাইজড কৃত্রিম চোখের সুবিধাসমূহ

প্রতিটি মানুষের অক্ষিকোটরের ভেতরের মাপ, আইরিসের রং ও স্ক্লেরা বা সাদা অংশের রং ভিন্ন হয়। ব্যক্তিভেদে এসব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সঠিক মাপ ও রং মিলিয়ে জীবাণুমুক্তভাবে যে কৃত্রিম চোখ তৈরি ও সংযোজন করা হয়, তাকেই কাস্টমাইজড কৃত্রিম চোখ বলা হয়। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন এই কৃত্রিম চোখ পিএমএমএ বা সিলিকন মেডিকেটেড ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরি হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে না।

এই কৃত্রিম চোখে ময়লা পানি ঢোকার সম্ভাবনা নেই। এটি দেখতে অনেকটাই স্বাভাবিক চোখের মতো, ফলে বাইরে থেকে দেখে কৃত্রিম চোখ শনাক্ত করা কঠিন। প্রতিদিন খুলে পরিষ্কার করার প্রয়োজন হয় না; মাসে একবার পরিষ্কার করলেই যথেষ্ট। স্বাভাবিক চোখের মতো নড়াচড়া করে এবং প্রয়োজনে আকার, রং বা মাপে সহজেই পরিবর্তন করা যায়।

৪. রেডিমেড কৃত্রিম চোখ সংযোজনে অসুবিধাসমূহ

রেডিমেড কৃত্রিম চোখ সাধারণত প্লাস্টিকের উপাদান দিয়ে তৈরি হয় এবং জীবাণুমুক্ত করার মানসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় না। প্লাস্টিক হওয়ায় এগুলো ঠিকভাবে পালিশ করা সম্ভব নয়। আকার, আকৃতি, আইরিস ও স্ক্লেরার রং নির্দিষ্ট ধরনের হওয়ায় ব্যক্তিভেদে মানানসই হয় না। ব্যবহারের সময় প্রায়ই ময়লা পানি আসে, নিয়মিত খুলে পরিষ্কার করতে হয়, যার ফলে অক্ষিকোটরের ভেতরের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

৫. শিশুরা কখন কাস্টমাইজড কৃত্রিম চোখ সংযোজন করতে পারবে

শিশুদের ক্ষেত্রে ক্যান্সারজনিত কারণে, জন্মগতভাবে চোখ না থাকা অথবা আঘাতজনিত কারণে অপারেশনের মাধ্যমে চোখ অপসারণ করতে হলে যত দ্রুত সম্ভব কাস্টমাইজড কৃত্রিম চোখ সংযোজন করা উচিত। দেরি হলে অক্ষিকোটরের ভেতরে মাংসপেশি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে গঠন নষ্ট হয়ে যেতে পারে, যা পরবর্তীতে কৃত্রিম চোখ সংযোজনকে জটিল করে তোলে।

৬. অরবিটাল ফেসিয়াল প্রস্থেসিস কী

অরবিটাল ফেসিয়াল প্রস্থেসিস হলো এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে কৃত্রিম চোখের পাশাপাশি চোখের পাতা ও পাপড়ি প্রতিস্থাপন করা হয়। দুর্ঘটনা বা ক্যান্সারের কারণে অনেক সময় অকুলোপ্লাস্টিক সার্জনের মাধ্যমে চোখের পাতা ও পাপড়ি অপসারণ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে রোগীর ত্বকের রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পিএমএমএ ও সিলিকন দিয়ে কৃত্রিম চোখ, চোখের পাতা ও পাপড়ি তৈরি করা হয়। প্রয়োজনে স্পেকট্যাকল প্রস্থেসিসের মাধ্যমেও এই প্রতিস্থাপন করা সম্ভব।

কৃত্রিম চোখে দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও এটি রোগীর নিঃসঙ্গতা দূর করে একটি স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন ফিরে পেতে সহায়তা করে।
কাস্টমাইজড কৃত্রিম চোখ সংযোজন করুন, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেকে উপস্থাপন করুন।

 

লেখক: মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল (রাসেল), চক্ষু পুনর্বাসন ও কৃত্রিম চক্ষু সংযোজন বিশেষজ্ঞ।
এমপিএইচ (ঢাকা), এমএসসি ইন অপটোমেট্রি (পাঞ্জাব); লং-টার্ম ফেলো ইন অকুলারিস্ট (এমওপি, মুম্বাই); অ্যাডভান্সড ট্রেনিং ইন ভিশন থেরাপি ও কন্টাক্ট লেন্স (আরইএইচ, পাঞ্জাব); কনসালটেন্ট অকুলারিস্ট।
ডা. মঈন কৃত্রিম চক্ষু সংযোজন কেন্দ্র, ধামরাই, সাভার, ঢাকা এবং দৃষ্টি আই হাসপাতাল, বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *